বাংলাদেশে এ খাতে কার্যকর করহার ৫১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ২২ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও আইসিটি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কর কাঠামোসহ নীতির পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় গতকাল আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রা: উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও আইসিটি-নির্ভর প্রবৃদ্ধির নীতিগত অগ্রাধিকার’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এ বিষয়গুলো উঠে আসে। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্যে অ্যামচেমের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেডিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (পিডিপিএ) অনুমোদনের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘আইনটি প্রণয়নের শুরু থেকেই অ্যামচেম ধারাবাহিকভাবে এতে সম্পৃক্ত ছিল ও চূড়ান্ত আইনে অ্যামচেমের অধিকাংশ সুপারিশ প্রতিফলিত হয়েছে।’ এছাড়া অর্থ আইন ২০২৬-এর আওতায় ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর অব্যাহতি এবং কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগকেও স্বাগত জানান সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল।
তিনি এক লাখ গ্রাহকসীমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন ডিজিটাল স্থায়ী স্থাপনা বিধানের বিষয়ে অধিকতর স্পষ্টতার দাবি জানান। একই সঙ্গে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী (আইএসপি) খাতের মোট প্রাপ্তির ওপর টার্নওভার কর ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশে বৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলোর জন্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ ও বহির্মুখী আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করারও দাবি জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে এর উন্নয়নে পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি পাঁচ বছর মেয়াদি কর কাঠামোর আওতায় ধারাবাহিক ও ভবিষ্যৎমুখী নীতি প্রণয়নের কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘বৈশ্বিক গড় ২২ দশমিক ২৭ শতাংশের তুলনায় বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে কার্যকর করের বোঝা ৫১ দশমিক ৫৬ শতাংশ।’ একই সঙ্গে সিম কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সংযোগের মান ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে থাকলেও সেবার মানের ক্ষেত্রে দেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।’
তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগের আওতায় শক্তিশালী ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা জানান। এ উদ্যোগে এস্তোনিয়ার এক্স-রোড প্লাটফর্ম অনুসরণ করা হবে এবং এটি বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। প্রত্যেক নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয়কে ব্যাংক হিসাব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
চতুর্থ অগ্রাধিকার এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৩-৩০ হাজার প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বের হন। তাদের এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা বিষয়ে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
পঞ্চম অগ্রাধিকার ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ। এ খাতে পোশাক শিল্পের অনুরূপ প্রণোদনা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ভিয়েতনামের উদাহরণ দেন তিনি। রেহান আসিফ আসাদ জানান, এক দশকে ভিয়েতনামের কনজিউমার ইলেকট্রনিকস রফতানি ১ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২১৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।’
অ্যামচেমের আইসিটি সাবকমিটির চেয়ার ও ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলার সঞ্চালনায় সভায় চারটি মূল বিষয়ে আলোচনা হয়। এগুলো হলো প্রতিযোগিতামূলক ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা, বিশ্বস্ত ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, এআই, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং সরকার ও শিল্প খাতের অংশীদারত্ব জোরদার করা।
আলোচনায় অ্যামচেমের আইসিটি খাতের নেতা এবং সিটিব্যাংক এনএ, সিসকো, এইচএসবিসি, মাস্টারকার্ড, মেটলাইফ, পাঠাও, পিডব্লিউসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, শপআপ, ভিসাসহ বিভিন্ন সদস্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা মেট্রোরেল ও টোল ব্যবস্থায় ওপেন-লুপ টিকেটিং চালু, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য বাংলা কিউআর এবং ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগ উন্মুক্ত করা, এনবিআর স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের আওতায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা, ব্যাংক ও এনবিএফআইয়ের ক্লাউড নীতিকে পিডিপিএর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পাবলিক ক্লাউড ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি, দ্রুত জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও আইনগতভাবে কার্যকর ইলেকট্রনিক চুক্তির ব্যবস্থা এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান। একই সঙ্গে শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার মাধ্যমে এআই ও ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষতার ঘাটতি পূরণের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়।
এসব বিষয়ে প্রধান অতিথি রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘আরএফআইডি-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় টোল আদায় ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহের জন্য বাংলা কিউআর উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি” প্লাটফর্ম দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পেমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।’ পাশাপাশি বৃহত্তর স্টার্টআপ কমিউনিটির সঙ্গে পরামর্শ করে স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের বিধানগুলো আরো কার্যকরভাবে পরিমার্জন করা হবে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তাকে নিজের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধামন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি যৌথ দলের মাধ্যমে জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।’
দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা ৬ টেরাবাইটের বিপরীতে সর্বোচ্চ জাতীয় চাহিদা ১২ টেরাবাইটে পৌঁছেছে। প্রতি দুই বছরে ডেটা ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে।’
নতুন সাবমেরিন কেবল স্থাপনে দুই-তিন বছর সময় লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অ্যামচেমের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমেদ। সভায় অ্যামচেমের নির্বাহী কমিটির সদস্য, আইসিটি খাতের সদস্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তারা অংশ নেন।